বিদায় হজ্বের ভাষন~~Hedaet Forum~~


Email: Password: Forgot Password?   Sign up
Are you Ads here? conduct: +8801913 364186

Forum Home >>> Blogs, Variety >>> বিদায় হজ্বের ভাষন

Tamanna
Modarator Team
Total Post: 7379

From:
Registered: 2011-12-11
 

শুক্রবার, ৯ জ্বিলহজ, ১০ হিজরী বর্ষে আরাফার দিন দুপুররে পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লক্ষাধিক (১,২৪,০০০ মতান্তরে ১,৪৪,০০০) সাহাবীর মহাসমাবেশে হজ্বের সময় বিখ্যাত এই ভাষণ দেন। হামদ এবং সানা তথা মহান রবের প্রশংসা স্তুতি জ্ঞাপনের মাধ্যমে আরাফা প্রাঙ্গনের জাবালে রহমতের পাদদেশে উপস্থিত জনসমুদ্রের উদ্দেশ্যে স্বীয় ভাষন শুরু করেন মহানবী। তিনি ইরশাদ করেন,

'সকল প্রশংসা কেবল আল্লাহ তাআ'লার প্রাপ্য। আল্লাহ পাক ছাড়া আর কোনো মা’বুদ নেই। তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই। আল্লাহ তাঁর ওয়াদা পূর্ন করেছেন। তিনি তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন। আর তিনি একাই বাতিল শক্তিগুলো পরাভূত করেছেন। আমরা তাঁরই প্রশংসা করি এবং আমরা তাঁরই নিকট সহায়তা ও সাহায্য প্রার্থনা করি। এবং তাঁরই কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি। আমরা তাঁরই নিকট আমাদের নফসের অমঙ্গলময় ও পাপপূর্ন প্ররোচনা থেকে এবং তার পরিনতিতে আমাদের নিজেদের পাপকর্ম থেকে আশ্রয় চাই। আল্লাহ তাআ'লা যাকে পথ দেখান কেউ তাকে পথভ্রষ্ট করতে পারে না - আর যাকে বিপথগামী হতে দেন, তাকে কেউ পথ প্রদর্শন করতে পারে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ তাআ'লা ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। তিনি এক ও একক। তাঁর কোন শরিক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা এবং প্রেরিত রাসূল।

হে আল্লাহর বান্দাগন! আমি তোমাদের আল্লাহর ইবাদত ও তাঁর বন্দেগীর ওসিয়ত করছি এবং এর নির্দেশ দিচ্ছি এ ব্যাপারে যে তোমরা আল্লাহ পাকের আনুগত্য কর। তোমাদের সামনে আমিই নেক কাজের সূচনা করেছি।

হে উপস্থিত লোক সকল! তোমরা আমার কথা শোন। এবারের পর এই স্থানে তোমাদের সাথে আর সাক্ষাত নাও হতে পারে। তোমাদের রক্ত এবং ধন-সম্পদ পরস্পরের জন্য চিরস্থায়ীভাবে হারাম করা হলো। যেমন আজকের এই দিন, এই মাস এবং তোমাদের এই শহর সকলের জন্য হারাম (পবিত্র ও নিরাপদ)। সাবধান! আমি তোমাদের কাছে এই সত্যের বানী পৌঁছে দিলাম। হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন। তোমাদের মধ্যে যার কাছে অন্যের আমানত রয়েছে সে যেন তা তার মালিকের নিকট পৌঁছে দেয়।

শোনো, জাহিলিয়্যাতের সময়েল কুপ্রথাদি আমার পদতলে পিষ্ট করা হয়েছে। জাহিলিয়্যাতের খুনও খতম করা হয়েছে। সর্বপ্রথম আমি আমের বিন রবীয়ার খুনের দাবি রহিত করলাম। জাহিলিয়্যাত যুগের সমস্ত সুদ বাতিল করা হলো। সর্বপ্রথম আমি আমার চাচা আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালিব এর সুদ রহিত করলাম।

জাহিলিয়্যাত যুগের সমস্ত পদ পদবী ও সম্মান বাতিল করা হল। কেবল আল্লাহর ঘরের হিফাজত, সংরক্ষণ ও হাজিদের পানি পান করানোর ব্যবস্থা আগের মতো বহাল থাকবে। যে ইচ্ছাপূর্বক কাউকে হত্যা করলো তার বদলা (কিসাস) একশো উট নির্ধারন করা হল। যে ব্যক্তি এরচে' বেশি চাবে তার এ কাজ জাহিলিয়্যা যুগের কাজ বলে গন্য হবে।

হে উপস্থিত জনতা, এই ভূমিতে আবার শয়তানের পূজা হবে- এ বিষয়ে শয়তান নিরাশ হয়ে গেছে। কিন্তু এই ভেবে সে খুশি যে, অন্যান্য গোনাহের কাজে তোমরা তার অনুসরন আনুগত্য করবে। সুতরাং তোমাদের দীনের বিষয়ে তোমরা শয়তান থেকে সাবধান থেকো।

হে মানব জাতি, বছরের মাসগুলোকে আপন জায়গা থেকে সরিয়ে দেয়া কুফর বৃদ্ধি করারই নামান্তর। এক বছর তারা এটাকে (হারাম মাসকে) হালাল এবং অন্য বছর তারা একে হারাম করতো, যাতে সেই গণনা যা আল্লাহ পাক নির্ধারন করেছেন তা পূর্ন করতে পারে। নিশ্চয়ই যামানা ঘুরে সেই জায়গায় এসে গেছে যেখান থেকে সৃষ্টি জগতের সূচনা হয়েছিল। আল্লাহ পাকের কাছে গণনায় মাসের সংখ্যা বারোটি যা আল্লাহর কিতাবে সংরক্ষিত রয়েছে। যখন থেকে আল্লাহ পাক আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন তখন থেকেই চারটি মাসকে হারাম (পবিত্র এবং নিরাপদ) ঘোষনা করেছেন। তিনটি মাস ক্রমানুসারে যুক্ত এবং সেগুলো হলো, যিলক্কাদ, যিলহাজ্ব ও মুহাররম। বাকি একটি বি্চ্ছিন্ন আর তা হচ্ছে জমাদিউসসানী ও শা'বান মাসের মধ্যবর্তী মাস রজব মাস। সাবধান! আমি তোমাদের কাছে সত্যের দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছি। হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন।

হে মানবজাতি, তোমাদের নারীদেরকে তোমাদের উপর কিছু অধিকার দেয়া হয়েছে। তোমাদেরও তাদের কাছে কিছু অধিকার প্রাপ্য রয়েছে। তোমাদের স্বামীদের শয়নকক্ষে তোমরা ছাড়া আর কাউকে আসতে না দেয়া তোমাদের কর্তব্য। কোন নির্লজ্জ ও অশ্লীল কাজ করা স্ত্রীদের উচিত নয়।

হে লোক সকল! আমি নারীদের সম্পর্কে তোমাদের হুশিয়ার করে দিচ্ছি- তোমরা যখন তাদের উপর নির্মম ব্যবহার কর তখন আল্লাহ পাকের শাস্তি সম্পর্কে নির্ভীক হয়ো না। তোমরা অবশ্যই তাদেরকে আল্লাহর জমীনে গ্রহন করেছ এবং তাঁরই কালিমার মাধ্যমে তাদের সাথে তোমাদের সম্পর্ক হয়েছে। জেনে রেখো, নারীদের পুরুষদের অধীন করা হয়েছে। তাদের উপর তোমাদের যেমন অধিকার রয়েছে তেমন তোমাদের উপরও তাদের অধিকার রয়েছে। সুতরাং, তাদের কল্যান সাধনের ব্যাপারে তোমরা আমার উপদেশ গ্রহন কর।

হে মানবজাতি, তোমাদের দাসদাসীর ব্যাপারে সাবধান! তোমরা যা খাবে তাদের তা খাওয়াবে। তোমরা যা পড়বে তাদের তাই পড়তে দিবে।

হে কুরাইশ সম্প্রদায়ের লোকেরা! তোমরা দুনিয়ার বোঝা নিজের ঘাড়ে চাপিয়ে যেন আল্লাহর সামনে হাজির না হও। আমি আল্লাহর বিরুদ্ধে তোমাদের কোনোই উপকার করতে পারব না।

হে মানবজাতি, সকল মুসলমান ভাই ভাই। কোন মুসলমানের পক্ষে তার ভাই এর অনুমতি ব্যতিত তার সম্পদ গ্রহন করা বৈধ নয়। স্বয়ং আল্লাহ পাক প্রত্যেক হকদারের হক নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। সন্তান যার ঔরসে জন্মগ্রহন করেছে তাকে হক অবশ্যই দিতে হবে। ব্যাভিচারীর জন্য রয়েছে প্রস্তরাঘাতের শাস্তি। যে ব্যক্তি নিজের পিতার স্থলে অপরকে পিতা বলে পরচিয় দেয়, যে নিজের মাওলা বা অভিভাবককে ছেড়ে দিয়ে অন্য কাউকে মাওলা বা অভিভাবক বলে পরচিয় দেয় তার ওপর আল্লাহর লা’নত। ঋণ অবশ্যই ফেরত দিতে হবে। প্রত্যেক আমানত তার হকদারের কাছে অবশ্যই আদায় করে দিতে হবে। কারো সম্পত্তি সে যদি স্বেচ্ছায় না দেয়, তবে তা অপর কারো জন্য হালাল নয়। সুতরাং তোমরা একজন অপরজনের ওপর জুলুম করবে না। এমনভিাবে কোনো স্ত্রীর জন্য তার স্বামীর সম্পত্তির কোনো কিছু তার সম্মতি ব্যতিরিকে কাউকে দেয়া হালাল নয়। যদি কোনো নাক, কান কাটা হাবশি দাসকেও তোমাদের আমির বানিয়ে দেয়া হয় তবে সে যত দিন আল্লাহর কিতাব অনুসারে তোমাদের পরিচালিত করবে, ততদিন অবশ্যই তার কথা মানবে, তার প্রতি আনুগত্য প্রর্দশন করবে।

শোনো, তোমরা তোমাদের প্রভুর ইবাদত করবে। পাঁচ ওয়াক্ত সালাত যথারীতি আদায় করবে, রমজানের রোজা পালন করবে, স্বেচ্ছায় ও খুশি মনে তোমাদের সম্পদের জাকাত দিবে, তোমাদরে রবের ঘর বায়তুল্লাহর হজ করবে আর আমিরের ইতা’আত করবে, তাহলে তোমরা জান্নাতে দাখিল হতে পারবে।

হে লোক সকল! আমার পর আর কোনো নবী নেই, আর তোমাদের পর কোনো উম্মতও নেই। আমি তোমাদের কাছে দু’টো জিনিষ রেখে যাচ্ছি। যতদিন তোমরা এ দু’টোকে আঁকড়ে থাকবে, ততদিন তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। সে দু’টো হলো- আল্লাহর কিতাব এবং আমার সুন্নাত।

তোমরা দীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি থেকে বিরত থাকবে। কেননা তোমাদের পূর্ববর্তীগন দীনের ব্যাপারে এই বাড়াবাড়ির দরুন ধ্বংস হয়েছে।

শোনো, তোমরা যারা উপস্থিত আছো, যারা উপস্থিত নেই তাদের কাছে এই পয়গাম পৌঁছে দিও। অনেক সময় দেখা যায়, যার কাছে পৌঁছানো হয় সে পৌঁছানেওয়ালার তুলনায় অধিক সংরক্ষণকারী হয়।

হে লোক সকল! আল্লাহ তাআ'লা ইরশাদ করছেন, হে মানবজাতি, তোমাদের আমি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে পয়দা করেছি এবং তোমাদের সমাজ ও গোত্রে ভাগ করে দিয়েছি যাতে তোমরা পরস্পরের পরিচয় জানতে পারো। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আল্লাহর দরবারে অধিকতর সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী, যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়া অবলম্বন করে, সব বিষয়ে আল্লাহর কথা অধিক খেয়াল রাখ। ইসলামে জাত, শ্রেনিভেদ ও বর্নবৈষম্য নেই।

হে মানবজাতি, তোমাদের সবার প্রভূ এক, তোমাদের সকলের আদি পিতাও এক, সুতরাং আরবের ওপর কোনো আজমের, আজমের ওপর কোনো আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। তেমনি সাদার ওপর কালোর বা কালোর ওপর সাদার কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। মর্যাদার ভিত্তি হলো কেবলমাত্র তাকওয়া।'

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ভাষনের শেষে উপস্থিত সাহাবীদের জিজ্ঞেস করলেন, হে লোকসকল! কিয়ামতের মাঠে আল্লাহ তাআ'লা তোমাদেরকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তোমরা কি জবাব দিবে? সমবেত সবাই সমস্বরে উত্তর দিলেন, আমরা সাক্ষ্য দিব, আপনি নিশ্চয় আপনার ওপর অর্পিত আমানত আদায় করেছেন, রিসালাতের দায়িত্ব যথাযথ আনজাম দিয়েছেন এবং সবাইকে নসিহত করেছেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আকাশের দিকে পবিত্র শাহাদাত অঙ্গুলি তুলে আবার নিচে সমবেত লক্ষাধিক সাহাবীর দিকে নামালেন। এবং ভারাক্রান্ত কন্ঠে তিন বার উচ্চারন করলেন, আল্লাহুম্মাশহাদ! আল্লাহুম্মাশহাদ! আল্লাহুম্মাশহাদ! অর্থ- হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন। হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন। হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন।

এরপরে ভাবের আতিশয্যে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছুক্ষন নিরব থাকেন। জান্নাতী এক নূর যেন তাঁর পবিত্র চেহারাকে মুনাওয়ার করে দিল। নবুয়তের গুরুদায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার পর তাঁর অন্তরে যেন স্বর্গীয় স্বস্তি নেমে এল। আর সেই সময়ে নাজিল হয় কুরআনে পাকের বিখ্যাত আয়াত-

الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الإِسْلاَمَ دِينًا

অর্থ- 'আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্নাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।' সূরাহ আল মা-য়িদাহ, আয়াত-৩

হযরত উমর ফারুক রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু এই আয়াত শুনে কাঁদতে শুরু করেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি বললেন, কাঁদছি এজন্যে যে, পূর্নতার পর তো শুধু অপূর্নতাই বাকি থাকে।

এরপর প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে মানবসকল! তোমরা যারা এখানে উপস্থিত রয়েছো, তারা এই বানী অনুপস্থিতদের নিকট পৌঁছে দিও।